Skip to main content

কখনো যদি আবার…

 


মুখড়া :


“কখনো যদি আবার মনে পড়ে  এই গান 

মেঘলা কোনো বিকেল, অথবা ঝড়ের রাত 

মনে  রেখো তবু, শুধু তোমারি জন্য গেয়েছিলাম…”


গানটা চলছিল রেডিওতে। FM এ পুজোর পরেও ওরা এই বছরের নতুন গান চালায়। জুঁথি আমেরিকায় থাকতে কলকাতার এই একটা জিনিস খুবই মিস করে। যদিও বা ডিজিটাল FM এ গান শুনতে পেলেও আসল আকর্ষণ, RJ দের উপস্থাপনা শোনা থেকে বঞ্চিতই থাকে। টানা ১০ বছর পর পুজো দেখার সুযোগ এইবার কলকাতায়, তাও শেষবার ৬ বছর আগে দিল্লির সি আর পার্কের ফ্ল্যাটেই কেটে গেছে পুজোর সময়টা। ঠিক পুজোর আগেই,ওর মায়ের হঠাৎ এক সকালে আর ঘুম ভাঙেনি, করোনারি থ্রম্বোসিস। তারপর টানা ৬টা বছর কিভাবে কেটে গেছে তার হুঁশই নেই। বাবাও এখন রিটায়ার করে রাজারহাটে একটা ফ্ল্যাটে একাই থাকেন, যেখানে এখন জুঁথি উঠেছে।


জুঁথি ফোনে ওর স্কুলের বন্ধু রেণুকার সাথে চ্যাট করতে করতে FM এ হঠাৎ গানটা শুনে ফোন থেকে মুখ ঘুরিয়ে রেডিওটার দিকে এমন একটা অভিব্যক্তি নিয়ে তাকিয়ে থাকলো যেন কোনো অবিশাস্য কিছু একটা ওর সামনে ঘটছে যার ওপর ওর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ওর হুঁশ হলো যখন হাতের ফোনটা অসম্ভব জোরে রিং হয়ে উঠলো। নিজেকে তাৎক্ষণিক সামলে নিয়ে ফোনটা ধরতেই ওপর প্রান্তে রেণুকার কণ্ঠ ভেসে এলো। 

“ কি রে তোকে দেখ কতগুলো মেসেজ করেছি , এই তো বললি কোনো কাজ নেই। কে কে উইশ করলো রে ? বাড়িতে কি কেউ এসেছে নাকি? ওদিকে সন্ধ্যের তোর বার্থডে পার্টির প্ল্যান তো হলোই না ” এক দমে কথাগুলো বলে গেলো রেণুকা। স্কুল থেকেই অসম্ভব বক্কমবাগীশ রেণুকা, আর জুঁথি ঠিক তার উল্টো, পেটে বোমা মারলে দুটো কথা বেরত। 


জুঁথির তখনও যেন ঘোর  কাটেনি। রেনুকাকে থামিয়ে বললো ‘ না রে এই খেয়াল করলাম। ’ রেণুকা আবার বাম্পার টপকে থার্ড গিয়ারে “ এই হল সায়েন্টিস্টের খামখেয়ালিপনা, আবার কি নিয়ে পড়লি বলত ? সামনে তোর এত বড় একটা কাজ, এখন কদিন একটু গবেষণা টবেষণা ভুলে থাক তো। আগে বল সন্ধ্যেবেলা আসছিস তোরে ? কাকু এখনই তোর দেশের বাড়ি না গেলে চিন্তা করতাম না। আমি কিন্তু তোর অনারে আমার বন্ধুদের আর কম্যুনিটির কিছু গণ্যমান্যদের অলরেডি বলে ফেলেছি, প্লিজ ডোবাসনা, সময়ে আসিস।” জুঁথি ওকে থামিয়ে ‘ ওরে না রে আমি আসবো চিন্তা করিসনা, একটু ব্যাস্ত হয়ে পড়েছি, তোকে একটু পরে করছি ‘ কথাটা বলেই রেনুকাকে সুযোগ না দিয়েই ফোনটা কেটে দিলো। 


আগের বছর ওর নতুন পেটেণ্ট টা নিয়ে আমেরিকার সাইন্স জার্নাল নেচার এ কভার স্টোরি করার পরে রীতিমতো বাংলার মেয়ে বলে ফলাও করে খবরটা বেরিয়েছিল এখানকার খবরের কাগজে আর তার পর থেকেই সে জানে এই সেলিব্রিটি স্টেটাসের বোঝা তাকে বইতে হবে। যদিও সামনের মাসেই ওর বিয়ে, যে কোনো মেয়ের কাছে এই সময়টা সেলিব্রিটি স্ট্যাটাসের চেয়ে কম কিছু নয়, তবুও সেই দিনের কথা ভেবে ওর এখনও বিশ্বাস হচ্ছেনা নিজের সিদ্ধান্তে!


উত্তেজনায় তখনও জুঁথির সমস্ত শরীর অবশ হয়ে আছে। জুঁথি শুধু ভাবছে যে কি করে এই গানটা শোনা সম্ভব। যুক্তি দিয়ে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করছে যে এই গানটা তো শুধু সেই শেষবারের মত শুনেছিলো, তা হলে কি…। আজকের দিনেই, এতটা  কাকতালীয়? এক লহমায় তার জীবনের যত্ন করে ভুলে থাকা অধ্যায়ের স্মৃতি যে এইভাবে তার দিকে আবার ধেয়ে আসবে স্বপ্নেও তা ভাবেনি জুঁথি। 


উত্তর কলকাতার এক অভিজাত সরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে মালদার মেয়ে জুঁথি, উচ্চ মাধ্যমিকে জেলা থেকে প্রথম ও রাজ্যের রাঙ্কিং এ পঞ্চম হয়ে সবে ভর্তি হয়েছে কেমিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে। শ্যামবাজারে তার কাকার বাড়ি থেকে খুব বেশি দূর নয় কলেজ। জুথির বাবা অবিনাশ মিত্র,ইসরোর এক গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকায় তার কলকাতায় থাকার প্রায় সময়ই হয়না, তাই তার ভাই ফিজিক্সের প্রফেসর অম্বরিশ বাবুই জুঁথির সমস্ত দায়িত্ত্ব সেচ্ছায় নিয়েছে। অম্বরিশবাবুর ছেলে তখন ক্লাস সিক্সে পড়ছে কিন্তু এর মধ্যেই তার দিদি তার কাছে আইডল। যেমন পড়াশুনায় ভাল, তেমনি শাস্ত্রীয়  সংগীতে পারদর্শী, অল বেঙ্গল আন্ডার ’নাইনটিন দাবা প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন আর সব চেয়ে বড় গুন হল এমন মিত্যভাষী নিরহঙ্কার মেয়ে মেলা ভার। শুধু তার কাকিমার কথায় “কলকাতায় থাকতে হলে তোকে কিন্তু একটু dashy pushy হতে হবে, আর নিজের জাহির না করতে পারলে এখানে কেউ পাত্তা দেবেনা বুঝলি ?”


প্রেম পর্ব


জুঁথির পক্ষ্যে মোটেই সহজ ছিলোনা প্রথম দিনগুলো, একে তো সে মফস্সলের মেয়ে, কলকাতার আদব কায়দায় অভ্যস্ত নয়, আর ছোট থেকে গার্লস স্কুলে পড়ে অভ্যস্ত, কো এড, তাও আবার কলেজ, তার মত কম কথা বলা মেয়ের মানিয়ে নিতে অসুবিধে হওয়ারই কথা কিন্তু তার মেধা সমৃদ্ধ শান্ত ব্যাক্তিত্ব সহপাঠীদের মধ্যে সম্ভ্রম ও কিছু মাত্রায় কৌতূহলের উদ্রেক করল। তা ছাড়া কলেজে এমনিতেই জুঁথির বাবার নামডাকের জন্যই হোক, অথবা তার কাকার প্রফেসরদের সাথে পরিচিতির কারণেই হোক, জুঁথি অল্পদিনেই কলেজের চর্চিত নাম হয়ে উঠল। আলাপী সে বরাবরেই তেমন নয় বলে তার স্কুলের অনেক মেয়ে বন্ধুই তাকে দাম্ভিক ভাবতো, এখানেও ব্যতিক্রম হলনা। 


প্রথম বছরটা দেখতে দেখতে কেটে গেল। এরই মধ্যে মেয়ে সহপাঠীরা একে একে দোকা জুটিয়ে নিল। জুঁথি সব সময় পড়াশোনায় মুখ গুজে না থাকলেও কলেজের অনুষ্ঠানে এর মধ্যেই গান গেয়ে সবার নজর কেড়েছিল। ছেলেদের মধ্যে সে লক্ষ্য করেছে তাকে নিয়ে যথেষ্ট গুঞ্জন, এমনকি প্রিয়াঙ্কা বা রিয়া প্রায়ই জুঁথিকে নিয়ে ঠাট্টা করে বলত " জানিস তো ছেলেগুলো বোধহয় কেউ সাহস করে তোকে বলতে পারছেনা, ভাবছে স্টুডিয়াস মেয়ে যদি প্রপোজ করলে প্রিন্সিপালকে নালিশ করে দেয় আর কি" জুঁথির জীবনেও যে আগে কোন প্রেমের প্রস্তাব আসেনি তা নয়। 


প্রথমটা  এসেছিলো তার ক্লাস ফোরে প্রাইমারি স্কুলের ম্যাথস ক্লাসে (হ্যা ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত সে একটা ইংরিজি মাধ্যম কোয়েডেই পড়ে, পরে মেয়েদের জেলা স্কুলে ভর্তি হয়) অরিজিৎ তাকে একটা অঙ্ক  খাতার পাতা ছিড়ে বলে “ প্লিস এই অঙ্কটা করে দিবি ? না করলে আমার টিউশন স্যার আজও মারবে।” পাতাটা খুলে অঙ্ক কসার জন্য উল্টো পিঠে রাফ ওয়ার্ক করতে গিয়ে দেখে লাল স্কেচ পেন দিয়ে লেখা I L U. জুঁথিও বোকার মত অরিজিৎ কে জিজ্ঞেস’করে লেখাটার মানে কি, যার উত্তরে অরিজিৎ হাসি চেপে বলে “ তোদের বাড়িতে টিভিতে কেউ সিরিয়েল দেখেনা বলে এইসব বড়োদের ব্যাপার তুই কিস্সু জানিসনা। চিন্তা করিসনা আমি তোকে সব সিক্রেট শিখিয়ে দেব আর তুই শুধু অঙ্কগুলো দেখে দিস। আর I L U মানে হল I Love You বা ইলু। প্রেম পিরিতি সিরিয়ালে অর্ক পিয়ালীকে এটাই বলে প্রপোজ করেছিল।”


দ্বিতীয়টা ছিল প্রেম মিসাইল পর্ব। জুঁথি আর বর্ণালী তাদের গার্লস স্কুলের মাঠে খেলছিল হঠাৎ সাঁ করে উঁচু দেওয়ালের ওপর প্রান্ত থেকে একটা ঢিল বাঁধা কাগজের মন্ড এসে পড়ল তাদের পায়ের কাছে, দেওয়ালের অপর প্রান্ত থেকে একটা ক্ষণস্থায়ী বিটকেল হাসি মার্কা মুখের পতন হতেই অনেকগুলো ছেলের হর্ষধ্বনি ভেসে এলো। বুঝতে অসুবিধে হলোনা যে কেষ্ট ঠাকুরটি যখন লক্ষ্য ভেদ করছিল নীচে সখাকুল তার প্রতিভাকে তুলে ধরেছিল। এটা নতুন ব্যাপার নয় কারণ পাশের boys স্কুল থেকে প্রায়ই এরকম উড়ন্ত প্রেম পত্তর আসত। 


দুজনের মধ্যে কে সেই পাত্রী জানতে হলে ঢিল বাঁধা কাগজের দলা খুলে বোঝা গেল ক্লাস নাইনের ফার্স্ট গার্লই টার্গেট। এর পর একটা দমফাটা হাসির রোলে মাঠ ভোরে গেল। কেষ্ট ঠাকুরটি যথার্থই যাদব বংশীয়, নাম বাবুন যাদব। সেই কাগজে একটা প্রেম পদ্য ছিল। লেখাটা ছিল এক কথায় গুরুচন্ডালি, জগাখিচুড়ি ও বানান ভুলের ডিকশনারি, যেমন হল কালেকশন হলে হয় আর কি। লেখাটা এরকম ছিল:


Dear যুঁথি


" যখন থেকে দেখেছি তোমাকে যুঁথি

মনে মনে করেছি তোমায় আমার জীবনসাথী

পুরনিমা রাতের তুমি যেন মোর চাঁদ

তোমাকে না পেলে জীবন হবে full বরবাদ

তুমি হ্যাঁ বললেই যা চাও আমি দিতে পারি

I love you তাই ভুল করলে I am sorry

তুমিই আমার fast love, beleave me dear

তোমার বাড়ী মানিয়ে নেব dont be fear

যদি হও রাজি, ছুটির পরে বড় পুকুর পাড়ে

আমি থাকব, দেখা করব মোরা চুপিসাড়ে।


তোমার বাবুন যাদব।


স্কুল ছুটির আগের ফ্রি পিরিয়ডে জুঁথি, বর্ণালী, রেণুকা, মৈত্রী, পরমা সবাই মিলে খিল খিলিয়ে একটা খিল্লি প্রত্যাখ্যান পত্র লিখতে বসা হল। কিছুক্ষন পরে এক অনবদ্য কোরাস পদ্য সমৃদ্ধ এন্টি মিসাইল তৈরি হল।

অনেকটা এরকম:


Respected বেবুন বেয়াদব,


পাঁচিল পারে এক ঝলকের দেখা

হাসির বহর দেখেই আমার মনে লাগে ছেঁকা

বাইওলজির পাতায় তুমি অনেক দিনের চেনা

রাময়নেও উল্লেখ পাই, বীর, সঙ্গে বানর সেনা

দাদাভাই আমার, বোনটি আমি ছোট

বাড়ি এলে ফোঁটা দেব রাখি দেব দুটো

রাগ কোরোনা আরো দেব দুইখানি অভিধান

পরের বারের প্রেম পত্রে রাখতে তোমার মান

ঢিল বাঁধা দিল অনেক হল, পড়ায় দিও মন

দাঁড়িয়ে নিজে, বৌদি এনো দিও নিমন্ত্রণ 


ইতি তোমার বোন


তৃতীয় ও সাম্প্রতিক প্রপোজাল টা এসেছিল ওর মালদার বাড়ির তিনটে বাড়ি পরের প্রিয়জিতের কাছ থেকে ও কলকাতায় আসার আগের দিনে। ওরা দুজনেই একই টিউটোরিয়াল হোমে পড়ত। প্রিয়জিতের বাবা ওর বাবার খুব ভালো বন্ধু ছিলেন, ছিলেন কারণ ওদের মাধ্যমিকের পরেই উনি হঠাৎ একদিন রেলের ডিউটি সেরে বাড়ি ফিরে একটা বুকের কষ্ট অনুভব করেন, সেই রাতে ঘুমের মধ্যেই তিনি মাসিভ হার্ট আটাকে চলে যান চিরতরে।

ওরা বেশ ফোনে প্রায়ই পড়াশুনা নিয়ে পরীক্ষার সময় কথা বলত। সেদিন ফোনেই প্রিয়জিত জিজ্ঞেস করে “ কি রে শুনলাম কলকাতা চলে যাচ্ছিস কাল, তাহলে কি আর  আমাকে মনে পড়বে ? উত্তরে জুঁথি বলেছিলো “ হ্যা রে, বাবা সেরকমই ব্যাবস্তা করেছে কাকুর সাথে পরামর্শ করে, তুই আমার খুব ভালো বন্ধু, তোকে ভুলতে যাবো কেন?" উত্তরে প্রিয়জিত জিজ্ঞেস করেছিল " শুধুই কি ভালো বন্ধু ?" জুঁথি শুধু বলেছিল " ওকে আমি তোর বেস্ট ফ্রেন্ড তাইতো? আর তুই ও তো শুনলাম ব্যাঙ্গালোরে যাচ্ছিস। একটা কথা, তোর আবৃত্তিটা পারলে চর্চা রাখিস আর কলকাতায় এলে জানাস।" জুঁথি জানত প্রিয়জিত একদিন বলতই, কিন্তু ও জানে ওর কাছে প্রিয়জিত স্রেফ খুব ভালো বন্ধু তার বাইরে কিছুই ভাবেনি তাই ও সত্যি কথাটাই ওকে জানিয়েছে।


কলেজে প্রথম বর্ষে ছেলে বন্ধুদের থেকে সে একটু দূরত্বই বজায় রাখত। ডানাকাটা সুন্দরী না হলেও তার বুদ্ধিদীপ্ত দুটো চোখ কিন্তু কারোরই চোখ এড়ায়নি। এরকম ভাসা ভাসা চোখের তল খুঁজতে সবার অলোখ্যে যে কেউ কেউ প্রস্তুতি নিচ্ছিলোনা তা বলাই বাহুল্য। 


প্রথম পাত্র: ময়ূখ বিস্বাস, দোহারা চেহারার মেধাবী ছাত্র, হুগলি জেলার কামারপুকুরের বাসিন্দা, সেও জেলায় প্রথম ও রাজ্যে দশের মধ্যে থাকলেও জয়েন্টে এই কলেজে সর্বোচ্চ র্যাঙ্ক করে কেমিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে ভর্তি হয়েছে। তার বাবা এই কলেজেরি লাইব্রেরিয়ান। 

কেমিস্ট্রি ল্যাবে পার্টনার হিসেবে প্রথম আলাপ জুঁথির সঙ্গে। যে কোনো সাবজেক্ট নিয়ে অগাধ জ্ঞান থাকলেও ছেলেটাকে প্রথমে কেমন ভীরু ও কিছুটা ক্ষেপাটেই মনে হয়েছিল জুঁথির। ময়ূখ কেমন একটা মোহগ্রস্তের মত ল্যাবে ঘন্টার পর ঘন্টা পড়ে থাকত, ল্যাব আসিস্টেন্টকে বিভিন্ন কাজে হেল্প করত, এমনকি অন্য ক্লাস bunk করেও। 

ময়ূখকে নিয়ে রীতিমত রাগগিং করত সিনিয়ররা আর সহপাঠীরা এড়িয়ে চলত। শুধু জুঁথিকে পেলে ময়ূখ অনর্গল তার রোজকার এক্সপেরিমেন্ট থেকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতামত জানাত । এই ভাবে কখন যে ওরা বন্ধু হয়ে উঠেছিল কেউই খেয়াল করেনি। জুঁথির বন্ধুরা প্রথমে খেপিয়েছিল "কিরে শেষমেষ একটা কেমিক্যাল লোচা?" কিন্তু ওদেরকে সবসময় সিরিয়াস আলোচনা করতে দেখে বুঝেছিল এটা স্রেফ দুই পড়ুয়ার ইয়ারী।


জুঁথি ক্রমে বুঝতে পারছিল যে সে কেমন একটা আকর্ষণ বোধ করত ওর প্রতি, যদিও ওদের কথা বলতে শুধুই একাডেমিক আলোচনা। আর অবশ্যই দুজনের আর একটা কমন প্যাশন ছিল, সংগীত। ময়ূখের দাদু বিষ্ণুপুর ঘরানার এক প্রসিদ্ধ গায়ক ছিলেন। ময়ূখও ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম নিয়েছিল ছোট থেকে। সমানতালে ওয়েস্টার্ন মিউজিকের জ্যাজ, রক পপ, ব্লুজ সব নিয়েও চর্চা করত। ময়ূখ নিজেও ভালো কম্পোজ করত। প্রায়ই জুঁথিকে বলত " জানিস একটা নতুন কম্পসিশন করছি শুধু তোকেই একদিন শোনাবো" কলেজের মাঠে বসে এই ভাবেই ওদের সময় কেটে যেত। জুঁথিও যতটা কথা ময়ূখের সাথে বলত সে নিজেই অবাক হয়ে যেত। তবুও দুজনেরই যেন কোন তাড়া ছিলোনা। হয়তো দুজনেরই একটা ভয় ছিল যদি কোন এক্সক্লুসিভ রিলেশনের চাহিদায় বন্ধুত্বটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।


দ্বিতীয় পাত্র: রাহুল গাঙ্গুলী, অত্যন্ত সুপুরুষ, দক্ষিণ কলকাতার যাকে বলে একদম চোস্ত ছেলে, জয়েন্টে মাঝারি রেঙ্ক করেও সুপারিশে ভর্তি হয়েছে আই টি ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে সেকেন্ড ইয়ারে। কলেজে নিজের মার্সেডিস চালিয়ে আসে, সঙ্গে কিছু তোষামুদে বন্ধু। কাকা একজন রাজ্যের নামকরা মন্ত্রী হওয়ায় কলেজের ডি গ্রুপ স্টাফ থেকে কলেজের প্রিন্সিপাল ও তঠস্থ  হয়ে থাকে। 

প্রথম সপ্তাহেই রাহুল রীতিমতো জুঁথির পথ আটকে আলাপ সেরেছে “ হাই, আমি রাহুল।তুমি শুনলাম ফার্স্ট ইয়ারে যারা ভর্তি হয়েছে তার মধ্যে টপার ? Nice to meet you.

উত্তরে জুঁথি শুধু একটা থাঙ্কস বলেছিলো আর রাহুলের বাড়ানো হাতটা এড়িয়ে এক হাতে ওয়েভ করে ভদ্রতার হাসি হেসে এগিয়ে গেছিলো। তার মনে যে রাহুলের সুঠাম চেহারা একটুও দাগ কাটেনি তা নয় বরং তার নিজেকেই কেমন একটা অপ্রস্তুত লেগেছে। এর পর থেকে যে কোন অছিলায় রাহুল গায়ে পড়ে আলাপ করতে চাইলেও জুঁথি তেমন আমল দেয়নি, কিন্তু এতে বেশ বুঝতে পারছিল রাহুলকে বোধহয় সে আরো আকৃষ্ট করছে। 


দূর ঘটনা 


নিউটওনের ফ্ল্যাটে বসে, এ সি তেও ঘামছিল জুঁথি সেই দিনের কথা ভেবে যা তার জীবনকে সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়েছিল। এর মধ্যে কিছু ঘটনাক্রম না বললেই নয়। তৃতীয় বর্ষের এনওয়াল ফেস্টের সন্ধ্যেতে জুঁথি আর ময়ূখ একটা ডুয়েট পারফর্ম করে, যার পর থেকে সারা কলেজে রীতিমত তাদের সম্পর্ক নিয়ে আর কারোরই কোনো সন্দেহ থাকে না। এর পরেই একদিন ওরা দুজন কলেজ ক্যান্টিনে গল্প করছিল। হঠাৎই রাহুল কিছু সাঙ্গপাঙ্গকে নিয়ে এসে ময়ূখকে উদ্দেশ্য করে বলে " আচ্ছা তুই কি কিছু মনে করবি যদি আজ আমি আর জুঁথি ইভিনিং শো তে একটা সিনেমা দেখতে যাই?" আচমকা এরকম একটা প্রশ্নে ময়ূখ বিব্রত হলেও সটান জবাব দিল জুঁথির দিকে চেয়ে " তুই কি আজ ইভিনিং শোতে জাবি নাকি? পরশু ডিসারটেসনের পেপারগুলো জমা দিতে হবে কিন্ত। তুই বললে চল তিনটে টিকিট কেটে নি" জুঁথি আমতা আমতা করে কিছু বলার আগেই রাহুল বলে ওঠে " Sorry বস, ওটা আমি আর জুঁথি, তুই চাইলে ওদের সাথে বসে দেখতে পারিস" বলতে ওর সঙ্গীরা অট্টহাস্যে ফেটে পড়ে। এবার জুঁথি রুখে দাঁড়ায় " আচ্ছা তোর প্রবলেমটা কোথায় বলত? তোকে কে বলল আমি তোর সাথে যাব আর ময়ূখের সাথে এভাবে ব্যবহার করতে পরিসনা" রাহুল এবার ফুঁসে ওঠে " ম্যাডাম, বিদ্যের জাহির যতই কর, এই ছেলেটা তোমার কদর জীবনেও দিতে পারবেনা। আমি এখানকার পাঠ চুকিয়ে স্টেটসে সেটল করে যাবো আর আমার বিস্বাস তোমারও এই দেশে না পচে আমার সাথে যাওয়া উচিত, তোমার ট্যালেন্টের কদর ওরাই দিতে পারবে। Be practical…" আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল, ওকে থামিয়ে জুঁথি " আমি নিজের সামর্থ্যে বিশ্বাসী, আর for your kind information আমার বাবা ISRO তে আছেন, এবং বাবার মত অনেকেই চাইলে নাসার অফার গ্রহণ করে ওখানেই থেকে যেতেন, কিন্তু না, দেশের প্রতি দায়বদ্ধতার জন্য পারেননি । আমাকে যদি কখনো কাজের এক্সপোজারের জন্য বিদেশ যেতেও হয় দেশে ফিরে আসব। আর শুনে রাখ, ময়ূখ ও একদিন দেশের গর্ব হবে। সবচেয়ে বড় কথা হল আমি ওকে ভালোবাসি "

শেষের কথাগুলো শোনার ধৈর্য না দেখিয়ে রাহুল বেরিয়ে যেতে যেতে বলে গেল, "enough is enough, আমাকে, রাহুল গাঙ্গুলীকে ফিরিয়ে দিলে ওই মিডিল ক্লাস গাঁইয়াটার জন্য তো? Now you have to pay for it "


শুধু ময়ূখ তখনো এক দৃষ্টে জুঁথির দিকে চেয়ে রইল। বিস্বাস করতে পারছিলনা, এই শেষের কথাগুলো হয়তো ও নিজেই কোনোদিন সাহস সঞ্চয় করে বলত জুঁথিকে। 

একটু ধাতস্থ হয়ে শুধু বলল "ছাড় জুঁথি,ওর ভাষণে ভয় পাসনা, আমি থাকতে তোর কোন ক্ষতি হতে দেবনা।এখন বল কাল তোর জন্মদিন, কোথায় ট্রিট দিচ্ছিস ? আমার উপহারটা তোকে দিতে হবে তো।" জুঁথি ও কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার জন্য বলল " সত্যি বেকার সময় নষ্ট হলো। তোর কম্পসিশনটা শোনার জন্য আমিও ছটফট করছি রে। কাকুর বাড়ি তোকে ডাকতে পারলে খুব ভালো হত কিন্তু কাকিমাকে এত জবাবদিহি করতে হবে তাই ভাবছি কেমিস্ট্রি ল্যাবের পেছনে যে মাঠটা আছে ওখানেই মিট করি, তুই গিটার আনবি তো? 

ময়ূখ " অবশ্যই, তারপর না হয় পাশের ক্যাফেটেরিয়াতে ট্রিট টা দিস"

জুঁথি "আচ্ছা পেটুক তুই। তোকে ট্রিট না দিয়ে কোথাও যাচ্ছিনা "


পরের দিন যখন ওরা মিট করলো তখন প্রায় দুপুর দুটো বাজে। মাঠের মধ্যে একটা ছাতিম গাছের নিচে আগেই ময়ূখ দাঁড়িয়ে ছিল, দূর থেকে জুঁথিকে দেখে কেকের বাক্সটা খুলে তোড়জোড় শুরু করে দিল। জুঁথি আসতেই একটা গোবেচারা মুখ করে বলল "চ এবার কেকটা কাট পেটের ভিতরটা চীন চীন করছে।" 

জুঁথি "কার জন্মদিন বোঝা দায়… তুই আবার এসব করতে গেলি কেন ট্রিট তো আমার দেওয়ার কথা।" 

কোন কথার উত্তর না দিয়ে ময়ূখ পাশে গিটার টা বার করে বলল " আগে কেকটা কাট " এর পর হ্যাপি বার্থডে গাইতে গাইতে যখন জন্মদিন উজ্জাপন হচ্ছিল বেশ নিরীবিলিতেই, ওদের অলক্ষে কেউ বা কারা ওদের ওপর নজর রাখছিল দূর থেকে। ময়ূখ এরপর ওর উপহার, জুঁথির জন্য ওর করা কম্পসিশনটা ধরলো…


“কখনো যদি আবার মনে পড়ে এই গান 

মেঘলা কোনো বিকেল, অথবা ঝড়ের রাত 

মনে  রেখো তবু, শুধু তোমারি জন্য গেয়েছিলাম…”


গানটা শেষ হতেই মর্মান্তিক ঘটনাটা এক মুহূর্তের মধ্যে ঘটে গেলো। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ময়ূখ হঠাৎ জুঁথিকে আগলাতে জড়িয়ে ধরলো আর ওর মুখে এসে ফাটলো অ্যাসিডের শিশিটা, জুঁথিও ছিটকে আসা রাসায়নিকের প্রকোপে লুটিয়ে পড়লো ঘাসের ওপর. ওদিকে ময়ূখ তখন অসহ্য যন্ত্রনায় ছটফট করতে করতে চেতনা হারালো। জুঁথির দুই হাতের চামড়া পুড়ে গুটিয়ে গেছে, ওই অবস্থায় ও দেখার চেষ্টা করলো ল্যাবের দিক থেকে কিছু অস্পষ্ট দঙ্গল নিমেষে মিলিয়ে’গেল,ক্রমশ তার দৃষ্টিও ফিকে হয়ে এলো। 


কতক্ষন এইভাবে ওরা পড়ে ছিল কেউ জানেনা, ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রথমে দেখে সবাইকে নিয়ে আসে তারপর তাদের দ্রুত হস্পিটালাইজড করা হয়। ময়ূখের অবস্থা ছিল খুবই সঙ্গিন কারণ তার মুখ সম্পূর্ণ দগ্ধ হয়ে যায় আর চোখের অবস্থা ও বিপজ্জনক। জুঁথির দুটো হাত ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বিপদের আশঙ্কা কম ছিল। ওই অবস্থাতেও কলেজের প্রিন্সিপালকে বার বার জুঁথি আগের দিনের রাহুলের শাসানি ও ওই দিনে যে অস্পষ্ট কয়েক জনকে ও দেখেছিল সব বলেছিল। উনি আস্বস্ত করলেও জুঁথির মনে হয়েছিল কোনো এক অজ্ঞাত কারণে উনি অন্যমনস্ক ছিলেন। এমন একটা ঘটনা কেউই ঠাওর করতে না পারলেও কলেজে কানাঘুসো থেকে সবাই এর মধ্যে রাহুল ও তার দলবলকে এড়িয়েই চলছিল।এর পর কলেজে একদিন রাজ্যের বিদ্যুৎ মন্ত্রী শ্রী হরিপ্রসাদ গাঙ্গুলী, রাহুলের কাকা পা রাখলেন প্রিন্সিপালের সাথে দেখা করতে, তারপর সেখান থেকে হসপিটালেও গেলেন। ময়ূখকে ICCU র বাইরে কাঁচের ভেতর থেকে দেখলেন। তারপর জুঁথির সাথে দেখা করলেন।জুঁথি প্রিন্সিপালের বারণ সত্বেও মন্ত্রীমশাইকে অপ্রিয় কথাগুলো জিজ্ঞেস করে এর তদন্ত চাইলে, খুবই শান্ত কণ্ঠে হরিপ্রসাদবাবু বললেন “ মা, তোমার কথামত রাহুল যদি দোষী হয় ওর অবশ্যই শাস্তি হবে। কিন্তু জানকি মা, তোমরা যেইখানে বসে নিরিবিলিতে প্রেম করছিলে, তার পাশেই একটা খাল আছে পাঁচিলের ওপারে।ওখানে কিছু আন্টি সোশ্যাল এলিমেন্ট প্রায়ই নিজেদের মধ্যে ঝামেলা করে।জানো তো, পুলিশ প্রাথমিক ইনভেস্টিগেশনের পর জানিয়েছে, যে অ্যাসিড বোমাটা তোমাদের ওপর উড়ে এসে পড়ে ওরকম অ্যাসিড বালব ওই পাশের বস্তিগুলোতেই বদমাইসগুলো বানায়।ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করি, তোমরা তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠো.” জুঁথি প্রতিবাদ করে বলতে যাচ্ছিল যে সাধারণ অ্যাসিড বাল্বে হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড থাকে আর তাদের যেটা ছোড়া হয়েছিল সেটা নাইট্রিক অ্যাসিড, আর কোনো বাল্ব বা বাতলে নয় মুখ বন্ধকরা টেস্ট টিউবে যা পাশের ল্যাব থেকেই ছোড়া হয়েছিল...কিন্তু তার আগেই মন্ত্রীর নিরাপত্তারোহীরা মন্ত্রীবাবু কে সরিয়ে নিয়ে গেছিল, প্রেসকেও আসতে দেওয়া হয়নি।


সেইদিন রাত্রেই অবিনাশবাবু চেন্নাই থেকে ফ্লাইট নিয়ে চলে এসেছেন। তার পর থেকে হসপিটালেই পড়ে আছেন।ময়ূখের বাবা মা ও চোখের পাতা এক করেননি।তাদের ছেলে মৃত্যুর সাথে লড়াই করছে। যেই ছেলে সারাক্ষন ল্যাবকেই ঘর বাড়ি করেছিল তারই কি মর্মান্তিক পরিণীতি। অবিনাশবাবু সান্তনা দেওয়ার ভাষা পাচ্ছেন না, তবু বললেন “ আমি জুঁথির কাছে ময়ূখের কথা অনেক শুনেছি, ব্রিলিয়ান্ট  স্টুডেন্ট, এই হসপিটালের কর্ণধার আমার বিশেষ পরিচিত, চিকিৎসার কোনো ত্রুটি হবেনা, আমি সবরকম ভাবে আপনাদের পশে আছি”

কথাগুলো বলেও গলার ভেতরে একটা দলা পাকিয়ে যাওয়া তাকে মনে করিয়ে দিলো, ডাক্তার একটু আগেই তাকে বলেছেন “ ময়ূখকে কোনো ভাবে বাঁচানো গেলেও ওর মুখ এবং চোখ বাঁচাতে গেলে এখানে না রাখাই ভালো। ”


অপেক্ষা


একটু সুস্থ হতেই জুঁথিকে অনেক কষ্টে রাজি করিয়ে অবিনাশবাবু তার দিল্লির ফ্ল্যাটে নিয়ে যান। উনি বুঝেছেন পলিটিক্যাল প্রেসার ওনাদের বিপক্ষে,আর জুঁথি এখনো পুরোপুরি সুস্থ নয়, সেই ট্রমা থেকে বেরোতে পারেনি। সে জানে ময়ূখকে চেন্নাইতে শিফট করা হয়েছে, তার দৃষ্টিশক্তি যাতে উদ্ধার করা যায় তাই তার চিকিৎসা চলছে। এর মধ্যে এটাও জেনেছে যে প্রেসের কাছে তার সন্দেহের কথা বলার জন্য, ময়ূখের বাবা, মৃদুলবাবুর চাকরি গেছে। তিনি স্ত্রীকে নিয়ে নাকি ছেলের চিকিৎসার জন্য চেন্নাইতে পড়ে আছেন। অবিনাশবাবু কাজের মধ্যেও মেয়েকে দিল্লিতে এসে দেখে যান, ময়ূখের খবরের জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকে জুঁথি।


একদিন হঠাৎ তার বাবা তাকে সংবাদটা দেন “ ময়ূখ ছাড়া পেয়ে গেছে, দৃষ্টিশক্তি ফিরতে সময় লাগবে, এমনকি ওর ভোকাল কর্ড জখম হয়েছে, কিন্তু ওদের  পরিবারের কোনো খোজই আর পাওয়া যাচ্ছেনা। ওরা কামারপুকুর অথবা কলকাতা কোথাও যায়নি।” খবরটা শুনে কিছুদিন জুঁথি নাওয়া খাওয়া ছেড়ে দিলেও সময়ের প্রলেপে পুরোপুরি ভুলতে না পারলেও কেন ময়ূখ একবারও যোগাযোগ করলোনা সেটা ভেবে আগে তার অভিমান হলেও এখন রাগ হয় যে কিকরে সে ভীরুর মত তার ভালোবাসাকে ভুলে গেল নাকি সে ভালোই আছে নিজের মত। জুঁথিও বাবা মায়ের উৎসাহে আবার ভর্তি হয় দিল্লির এক কলেজে, তারপর পিএইচডি করে স্কলারশিপ নিয়ে হার্ভার্ড উনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে রিসার্চ করছে শেষ ৬ বছর ধরে। 


এরমধ্যেই তার একটা পেটেণ্ট নিয়ে সারা বিশ্বে খুবই আলোচিত হয় জুঁথি মিত্র। তার রিসার্চ একটা অদ্ভুত বিষয় নিয়ে, ট্রুথ সিরাম।এই বিষয় নিয়ে অনেকদিনই গবেষণা চলছে, এমন একটা ড্রাগ বার করা যার সেবনে মানুষ সত্যি কথা গড়গড় করে বলে ফেলবে।স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড থেকে আমেরিকার সিআইএ যে সমস্ত ড্রাগ ইন্টারোগেট করতে ব্যাবহার করে তার মধ্যে সোডিয়াম থিওপেন্টাল সবচেয়ে বেশি কার্যকরী।কিন্তু এই সমস্ত ইন্টারভেনস হিপনোটিক ড্রাগের যেমন কিছু খুব খারাপ সাইড ইফেক্ট আছে তেমনি যার ওপর প্রয়োগ করা হয় তার অজ্ঞাতে প্রয়োগ করা প্রায় অসম্ভব।


এখানেই আলাদা জুঁথির পেটেণ্ট, প্রথমত এটা এমন একটা পিলের মতো যা যে কোনো পানীয়ে বা পাওডার অবস্থায় খুব সহজেই মিশিয়ে দেওয়া’ সম্ভব, কারণ তার নিজস্ব কোনো গন্ধ, রং বা স্বাদ নেই।এরপর অন্য ট্রুথ সিরাম যেমন, যার ওপর প্রয়োগ করা হয় তাকে ঝিমিয়ে অথবা হালুসিনেটরি অবস্থায় নিয়ে যায় জুঁথির ম্যাজিক্যাল এজেন্ট তাকে অতিরিক্ত আত্মসচেতন অথবা এক কথায় সত্যবাদী যুধিষ্টির বানিয়ে দেয়। সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার এর প্রভাব বেশিক্ষন থাকেনা আর শারীরিক ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা একদম নেই বললেই চলে। শেষের কারণটার জন্যই জুঁথির আবিষ্কারের চাহিদা সমস্ত দেশের সামরিক ও ইন্টেলিজেন্সের কাছে অপরিসীম।ইন্টেলিজেন্স অথবা পুলিশ চাইলেও অনেক সময় হিউম্যান রাইটস এর চাপে অথবা সন্দেহভাজন অপরাধীর উকিলের আপিলে নারকো টেস্টে শারীরিক ক্ষতির দোহাইয়ে অন্য পন্থা বেছে নিতে হয়।এ ছাড়াও জুঁথির আবিষ্কার টেস্ট ফেজে পলিগ্রাফ, নারকো বা লাই ডিটেক্টরের চেয়ে বেশি কার্যকরী সিদ্ধ হয়েছে। অবিনাশ বাবুকে জুঁথি বলেছে “বাবা সবার আগে আমার কাজ যদি আমার দেশের কোনো কাজে আসে সেটা তুমি ব্যাবস্তা নাও” 


অজ্ঞাত পাত্র


এই ফাঁকে বলা যাক এমন একজনের কথা যার ব্যাপারে জুঁথি অকারণ দুর্বল হলেও মনকে কখনোই প্রবোধ দেয়নি কারন তার থেকে অযাচিত সাহায্য কিছুটা আকস্মিক ভাবেই সে পেয়েছে। তার সাথে কখনোই সামনা সামনি হয়নি তবু শুধু মাত্র কন্ঠস্বর শুনেই কেন এতটা চেনা মনে হয়েছে তাকে তার কোন ব্যাখ্যা নেই। আমেরিকা থাকতেই আলাপ রহস্যময় ভাবে, হঠাৎ একদিন একটা মেলে একজন তার কলেজের পূর্ব কাহিনী উল্লেখ করে, আর জানায় যে তার কাছে এই বিষয়ে অনেক তথ্য আছে যা শাস্তি দিতে পারে আসল অপরাধীকে। জুঁথি তার পরিচয় ও উদ্দেশ্য জিজ্ঞেস করলে সে জানায় সে ইন্টেলিজেন্সের একজন তাই ছদ্মনাম বলে “শুভাকাঙ্খী”। বার চারেক তার সাথে এর পর স্যাটেলাইট ফোনে কথা হয় আর তখনই কলেজ জীবনের এমন কিছু ঘটনার উল্লেখ করে সে যেন ভেতরে কেউ ফিসফিস করে বলে ওঠে “ময়ূখ নয় তো?” কিন্তু অসম্ভব রকম ঠান্ডা ব্যবহার তাই জুঁথি কখনোই সুযোগ পায়নি তাকে বাজিয়ে নেওয়ার। তবু সেই পুরোনো দগদগে ক্ষত যদি কেউ উস্কে দিয়ে পেছন থেকে সব কিছু সঞ্চালনা করে তাহলেও একদিন যদি ময়ুখের যবনিকা পতন হয় তাতেই বা ক্ষতি কি? এই সব ভেবেই সে মনেপ্রাণে তার এই অলীক বিশাসকে প্রশয় দিলেও অপেক্ষা করে কোন ইঙ্গিতের।


মনোনীত পাত্র


ঘোর কাটলো যখন ফোনে একটা মেসেজ ভেসে এলো “Hope you are enjoying your special day. Let me know when you are free”। জুঁথিকে কাল রাত বারোটায় প্রথম উইশটা সেই করে। আজ ওর মেসেজের রিপ্লাই দিতে বা কল করতে ইচ্ছে হলেও কিছু একটা বাঁদছিলো, কেমন একটা অসহায় লাগছিলো নিজেকে। জুঁথির কাছে ওর বাবা ওর সবচেয়ে বড় বন্ধু। যখন ওর বাবা ওকে অনুরোধ করে “ দেখ মনি, আমি জানি ময়ূখের মত কাউকেই আর তোর পক্ষে ভালোবাসা সম্ভব নয়, কিন্তু তুই যদি একবার সত্যবাণের সঙ্গে কথা বলে দেখিস, তারপর তোর ভালো না লাগলে আমি প্রথম ব্যাক্তি যে তোকে বারণ করবো।” ওর বাবা আরো বলেছিলো সত্যবান নাকি ইসরোর সম্পদ, ও এখন ক্রয়োজেনিক এনার্জি নির্ভর এক অভিনব স্পেস শিপ ব্যাটারী নিয়ে কাজ করছে তা যদি সফল হয় মহাকাশে জ্বালানির সমস্যার সমাধান করা যাবে।


বিগত এক বছর আগে প্রথম ওরা অনলাইনেই আলাপ করেছিল, তারপর গুটি কয়েকবার ফোনে কথা ও চ্যাট করেছে।ওর ভালো লেগেছে সত্যবান ও কম কথার মানুষ তাই কয়েক কথার পর ওদের তেমন কথা এগোয়নি। একবারই ভিডিও চ্যাট করেছে সাম্প্রতিক যখন ওদের বিয়ে পাকা হয়েছে তাও খুব ফর্মালি সত্যবান একটা কালো গগলস পরে থাকায় ওর চোখের ভাষা পড়া হয়নি। ওরা বেশি নিজের গবেষণার কথাই বলেছে, শুধু একটা ব্যাপার ওর অদ্ভুত লেগেছিলো, কথা বলতে বলতে ও বারবারই মাথায় হাত দিচ্ছিলো আর এই মুদ্রাদোষটা ওর খুব অস্বস্তিকর লেগেছিল। 



স্বীকারোক্তি



আবার জুঁথিকে ভাবনার অতল থেকে একটা ফোন কল উদ্ধার করলো।কলটা করেছিল প্রিয়জিত “কিরে ভুলে গেছিস আর দশ মিনিটের মধ্যে আমার আজকের স্পেশাল ইন্টারভিউ শো টা শুরু হচ্ছে।...তুই রেডি তো ?” হঠাৎ করে জুঁথির সম্বিত ফিরলো “আচ্ছা আগে বল তো একটু আগে যে গানটা তোরা চালালি কে গেয়েছে, আমি তোকেই কল করতে যাচ্ছিলাম এটাই জানার জন্য।’” প্রিয়জিত “ওরে আমার অনুষ্ঠানের শুরু হতে আর বেশি টাইম নেই, তোকে জেনে পরে বলছি। এখন কি প্রায়োরিটি, তুই বল ? ” জুঁথি শুধু হুম বলে ফোনটা কেটে দেয়। প্রিয়জিৎ, জুঁথির ছোটবেলার বন্ধু, ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করার পর তার ফার্স্ট প্যাশনের পেছনে দৌড়ে এখন শহরের সবচেয়ে জনপ্রিয় এফ এম চ্যানেলের লিড আর জে।


একটু পরেই এফ এম থেকে ভেসে এলো প্রিয়জিতের কণ্ঠ - হ্যালো এন্ড ওয়েলকাম টু এফ এম কলকাতা, আমি আর জে প্রিয়জিৎ, আবার এসে গেছি তোমাদের ফেভরিট শনিবারের দ্বিপ্রাহরিক প্রোগ্রাম,যার নাম হাড্ডাহাড্ডি আড্ডা’ নিয়ে। তোমাদের ভাত ঘুম উড়িয়ে, মহিলাদের হার্ট বিট বাড়িয়ে, আজ আমাদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার জন্য ষ্টুডিও তে হাজির, ইয়ুথ হার্ট থ্রোব, মোস্ট এলিজিবল ব্যাচেলর, বাংলার ক্যাবিনেটের কনিষ্ঠতম মিনিস্টার অফ কালচার এন্ড স্পোর্টস, যাকে অনেকেই রাজ্যের সম্ভাব্য সিএম ভাবছে এখন থেকেই ..ওয়ান এন্ড অনলি….শ্রী রাহুল গাঙ্গুলী।নমস্কার রাহুল বাবু…welcome to our special show!


জুঁথির চোয়াল শক্ত হচ্ছিল যখন ওদিকে আড্ডা ক্রমশ জমে উঠেছে। এই দিনটার জন্যই সে নিজেকে প্রস্তুত করেছে কত দিন ধরে। তার জীবনের অনেক হিসেব মেলানোর মুহূর্তগুলো সে উপভোগ করতে চায় আর ডেডিকেট করতে চায় তার হারিয়ে যাওয়া একমাত্র ভালোবাসাকে।


প্রিয়জিত:  " একটা কুইক কফি ব্রেকের পরে ফিরে এলাম প্রিয়জিত সঙ্গে জনপ্রিয় আমাদের সকলের দাদা, রাহুল গাঙ্গুলী। ( পেছনে তখন ভেসে আসছে সমস্বরে স্লোগান “ We Love R.G…”) আমাদের শুরুটা দূর্দান্ত হয়েছে, আমরা জেনেছি রাহুলবাবু কিভাবে শুধু দেশের সেবা করার জন্যই আমেরিকা থেকে এম বি এ করে কত চাকরির প্রলোভন ছেড়ে জনপ্রতিনিধি হয়েছেন। আমরা এও জেনেছি তার কাকা রুলিং পার্টির সিনিয়র মন্ত্রী শ্রী হরিপ্রসাদ বাবুর ত্যাগ ও নিষ্ঠার প্রতি অনুপ্রাণিত হয়ে কিভাবে জনসাধারণের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। 

এবার আসছি আমাদের ব্যাক্তিগত রাউন্ডের হাড্ডাহাড্ডি প্রশ্নে আর তারপর আমরা সরাসরি অডিও কলারকে নেব হট লাইনে। 


শুনেছি নাকি আপনার প্রিয় সখ ড্রাইভিং আর আপনার সংগ্রহে আছে মার্সিডিজ, বেন্টলে, অডি, বি এম ডব্লিউ এর মত তাক লাগানো কালেকশন? "


রাহুল: " এটা ঠিক যে আমি গাড়ির প্রতি খুবই সৌকিন তবে ছোট থেকেই আমার বাড়িতে বিভিন্ন গাড়ি দেখেছি আর বন্ধুমহলে সবাই আমাকে চ্যাম্পিয়ন রেসার হিসেবেই জানে।"


প্রিয়জিত: " আপনি বরাবরই খুব কালারফুল থাকতে ভালোবাসেন তাই জনতা যেটা শুনতে অধীর আগ্রহে বসে আছে, আপনার জীবনের প্রেম নিয়ে কিছু প্রশ্ন হয়ে যাক।

আচ্ছা আপনার জীবনে প্রথম প্রেম কবে কড়া নাড়ে?"


রাহুল: " সত্যি কথা বলতে আমরা মনে পড়েনা কোন ক্লাসে প্রথম...বোধহয় তখন ফাইভে পড়ি I had my first crush on a girl from class 7."


প্রিয়জিত: " কেয়া বাত? আপনারা নিশ্চই শুনছেন আমাদের রাহুল দা ছোট থেকেই কতটা ahead of time...lols 

আচ্ছা যদি জানতে চাই আজ অব্দি কতবার প্রেমে পড়েছেন আর যদি আপনাকে কাউন্ট করতে বলা হয়?"


রাহুল: " এই তো মুশকিলে ফেললেন, ওই নচিকেতার একটা গান আছেনা, কারো চোখ ভালো লাগে, কারো মুখ ভালো লাগে কার বা শরীরের গঠন.. ( প্রিয়জিত " ওটা চরিত্রের গঠন হবে ") ..হ্যা ওই একই হল। আসলে আমাকেই মেয়েরা বেশি প্রপোস করে বসে, তখন সময়ের হিসেব থাকেনা শুধু ডেট কার সাথে সেটাই খেয়াল থাকে, কোন ডেটে সেটা অপ্রাসঙ্গিক, এরকম প্রশ্ন হবে আগে জানলে একটা খাতা মেনটেন করতাম।"


জুঁথির বুঝতে বাকি থাকেনা যে ইন্টারভিউ যত গড়াবে ততই কফিতে মেশানো তার আবিষ্কৃত ট্রুথ সেরাম রাহুলের জীবনের সত্যি কথাগুলো টেনে হিঁচড়ে তার অজান্তেই তাকে নগ্ন করে দেবে সমস্ত পৃথিবীর কাছে।


প্রিয়জিত: " একটা প্রশ্ন যদিও আপনার কাছে হয়তো অবাস্তব। আচ্ছা আপনাকে কি কোনো মেয়ে স্কুল বা কলেজে কখনো প্রত্যাখ্যান করেছে ? I mean dumped you for somebody else? 


রাহুল ( কিছুটা উত্তেজিত হয়ে ) " কলেজে একটা book worm type মেয়ে ছিল, বেকার অনেক labour দিয়েছিলাম। আমার বন্ধুদের সামনে সালি আমাকে outright no বলে তাও আবার একটা গাঁইয়া ভিখিরীর জন্য…


প্রিয়জিত: " দাদা বুঝতে পারছি আপনার খুব কষ্ট হয়েছিল, প্লিস যদি একটু নিজেকে কন্ট্রোল করেন।"


রাহুল: "আমাকে, রাহুল গাঙ্গুলীকে একটা রাস্তার মেয়ে কষ্ট দিয়ে পার পেয়ে যাবে ? 


প্রযোজিত: " সরি দাদা একটা কল নিয়ে নি...আমাদের সঙ্গে দেখি এখন কে আছেন? হেলো.. আপনার পরিচয় টা যদি দেন " 


রাহুল: বাঃ আমি তৈরি…মহিলা ফ্যান হলে বেস্ট!


জুঁথি : " আমাকে চিনতে পারছো মন্ত্রীমশাই ? আমিই তো সেই মেয়ে যে তোমার প্রস্তাব gutter এ ফেলে দি…কি মনে পড়ছে? আর মানুষের প্রতি দরদ, নাকি জিওরজিয়া উনিভার্সিটি থেকে ডিসিপ্লিনারি গ্রাউন্ডে রাসটিকেট করে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল, তারপর কাকাকে ধরে মন্ত্রী হওয়া ছাড়া গতি ছিলোনা তাই ? সমস্ত মেয়েরা যারা তোমার সংস্পর্শে এসেছে তাদেরই তুমি ইউস করে ফেলে দিয়েছো। মনে পড়ে আজকের দিনেই তুমি আমাকে ও আমার ভালোবাসাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিলে কিন্তু সেটাও পারনি।


(একটা আকস্মিক উত্তেজনা হঠাৎ করে সেই পুরোনো ক্ষতে নুন ঘষে দেওয়ার মত কাজ করল, রাহুল এক লহমায় ভুলে গেল তার সাজানো বাস্তব)


রাহুল: " জুঁথি, You bitch, কিসের এত পড়াশোনার নাকি রূপের দেমাক ছিল তোর? তোর bastard lover এর কি অবস্থা করেছিলাম মনে নেই তোর? সেদিন যখন বার্থডের ফুর্তি করছিলিস লুসারটার সঙ্গে আমি নিজে কেমিস্ট্রি ল্যাবের পেছন থেকে নাইট্রিক এসিডের টিউবটা ছুড়ি... I hit the bulls eye, শুনেছি ময়ূখ অন্ধ হয়ে, পোড়া মুখ দেখাতে না পেরে বোধহয় সুইসাইড করেছে...তোর যদিও প্রথমে ক্ষতি করতে চাইনি but what to do you were bloody too stupid "


জুঁথি: "You shameless coward, ময়ূখের লাইফটা তুই শেষ করে এখনো বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছিস...you should be put behind the bars…আর তুই কিনা জন প্রতিনিধি?


রাহুল: "Hold your damn tongue… তুই জানিস আমি কে, আমার কত ক্ষমতা, তখন না হয় কাকুর হেল্প দরকার ছিল now I am enough...আমি চাইলে তোকে আমার ঘরের বাঁদী করে রাখবো….


জুঁথি: তুই কে সেটা জানতে চাস ? ইন্টারন্যাশনাল নারী পাচার চক্রের কিংপিন…..একজন ড্রাগ মাফিয়া….সবই তোর কাকার এনজিও “শান্তিনিকেতন” থেকে  আর ডার্ক ওয়েবের বেতাজ বাদশাহ, কোড নেম “চেঙ্গিশ” কি ভুল কিছু বললাম নাকি ধক নেই স্বীকার করার ? আজ সব তথ্যই লালবাজারে ইতিমধ্যে জমা পড়েছে।…এরপরেও পুরুষ মানুষ হলে স্বীকার করবি…


রাহুল: “You whore…” শালী তুই যা যা জানিস এসব কিছুই ’চুনোপুটি….শুনে নে ময়ূখের ফ্যামিলিকে রাজ্য ছাড়া করেছি, ওদের ভিক্ষা করার হাল ও রাখিনি। দুবাইয়ের সব চেয়ে বড় বিল্ডার ভিগনেস পিল্লাইয়ের সাথে কালই ডিলটা হলে সব পুলিশ, মন্ত্রী কিনে নেবরে। তুই আমার ক্ষমতার কিছুই জানিসনা, আমি চাইলে লাদেনের চেয়েও ভয়ঙ্কর তাবাহী ভারতের যে কোনো জায়গায় করতে পারি। একটা কল করবো আলকায়দা থেকে আইসিস আমাকে পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে লুকিয়ে রাখতে পারবে, কোনো সালা গভর্নমেন্টের বাপের সাধ্যি নেই….আজই তোকে মায়ের ভোগে পাঠাচ্ছি …এই আরিফকে স্যাটেলাইটে ধর….


(রাহুল মাইক, ল্যাপেল ছুড়ে ফেলে দিয়ে, চেয়ার লাথি মেরে, Swear করতে করতে হনহন করে বেরিয়ে গেলো উদ্ভ্রান্তের মত)


জুঁথির কাজ হয়ে গেছিল, প্রিয়জিত এবার চ্যানেলের damage control এ নেমে পড়ল। অনেক কষ্টে রাহুলকে সামলে জনগণের কাছে সেদিনের মত বিদায় নেয় বুকভরা তৃপ্তি নিয়ে। আজ সে তার বেস্ট ফ্রেন্ডকে জন্মদিনের বেস্ট গিফ্টটা দিতে পেরেছে, তার জীবনের মধুর প্রতিশোধটা নিতে হেল্প করে। তা ছাড়াও সে একটা মহান আবিষ্কারের সফল পরীক্ষা করেছে একটা গিনিপিগের ওপর। 


ওদিকে জুঁথি অঝোর ধারায় কাঁদছিল ফোনটা রেখে, এতটা সে তার গবেষণার সাফল্যের পর ও খুশি হয়নি। অস্ফুটে মুখ থেকে বেরিয়ে এলো বুকের মধ্যে জমা কথাগুলো স্বগতক্তির মত "ময়ূখ আমার বিস্বাস তুমি বেঁচে আছ, তুমি যেখানেই থাক আজকের পরে কিছুটা হলেও শান্তি পাবে, সেদিনে ট্রিট টা দিতে পারিনি...আজ তোমার হয়ে এটুকু করলাম, আজও তোমাকেই ভালোবাসি…কিন্তু তুমি এখনো সামনে কেন আসছ না?  এরপর বাবাকে কথা দিয়েছি প্লিস আমাকে ক্ষমা করো.... যদি শোনো আমি বিয়ে করেছি।" 


কথাগুলো বলে অনেক হালকা লাগছিল জুঁথির। সম্বিত ফিরে পেয়ে রাতের পার্টি নিয়ে রেণুকাকে এবার খোশ মেজাজে কলটা করা যাক, মনে হল জুঁথির ।


উপসংহার


সন্ধ্যের সব আয়োজন রেণুকা ও তার কলেজের বান্ধবী প্রিয়া করেই রেখেছিলো রেণুকাদের হাউসিং কমপ্লেক্সের কমিউনিটি হলে।  বার বার জুঁথি ওদের এতো বাড়াবাড়ি করতে বারণ করেছিল, ওরা শোনেনি।তা ছাড়া ওর মনটা এত আনন্দের দিনেও ভারাক্রান্ত ছিল কারণ একটা জরুরি কাজে ওর বাবা শেষ মুহূর্তে আসতে পারবেন না জানিয়েছেন। আজকের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার জন্য তার বাবা ছাড়া আর দুজনই আছে যারা সব ঘটনাটাই জানে। প্রিয়জিত ও সঙ্গে ওর গার্লফ্রেন্ড অজন্তাকে ও আগেই ইনভাইট করেছিল।অজন্তা খুব ভালো ক্লাসিক্যাল ডান্সার, প্রথম আলাপেই জুঁথির খুব ভালো বন্ধু হয়ে গেছিল।


জুঁথি বুঝলো এটা শুধুমাত্র ওর বার্থডে পার্টি নয় একটা সম্বর্ধনা সভাও বটে। পড়িয়ামে ওর সঙ্গেই উপস্থিত ছিলেন এই কমিউনিটির বাসিন্ধা, বাংলার এক স্বনামধন্য কল্পবৈজ্ঞানিক, ডক্টর রাধারমণ সান্যাল। ছিলেন জুঁথির কলেজের প্রিয় কেমিস্ট্রির প্রফেসর, রক্তিম বাবু, আর দুটো সিট খালিই ছিল। রেণুকাকে জিজ্ঞেস করায় ও বলেছিল ওই ব্যাপারে প্রিয়জিত জানে। বেশ বুঝতে পারলো তলায় তলায় অনেক আগে থেকেই সব আয়োজন করেছে বদমাইসগুলো, আর ভান করছিল যেন কিছুই ঠিক নেই।


জুঁথি দর্শক আসনে বসা তার স্কুল ও কলেজের কিছু চেনা মুখ দেখতে পেল, তা ছাড়া অন্যদের তার চেনার কথা নয়। ওর মনে হল আজকের ঘটনা নিয়ে বোধহয় অনেকেই নিজেদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু করে দিয়েছে।


প্রিয়জিত তার উপস্থাপনা শুরু করল রবি ঠাকুরের কবিতা দিয়ে -


"জন্মদিন আসে বারে বারে

মনে করাবারে–

এ জীবন নিত্যই নূতন

প্রতি প্রাতে আলোকিত

পুলকিত

দিনের মতন।”


জুঁথি ভাবলো সত্যিকারের পুলকিত হওয়ার মত একটা দিনই বটে। আসার সময় টিভিতে প্রতিটি চ্যানেলে দেখে এসেছে এফ এমের সাক্ষাতকারে মন্ত্রী রাহুল গাঙ্গুলির অশালীন ব্যাবহার ও ভয়ঙ্কর অপরাধের স্বীকারোক্তি। এরই মধ্যে তার পার্টি তাকে বহিস্কার ও করতে পারে বিরোধীদের চাপে এমনি শোনা যাচ্ছে। কিছু পেটোয়া সুশীল সমাজের হোতারা ব্যাপারটাকে একটা নারভাস ব্রেকডাউনের সাময়িক বিকারে ভুল বকা বলে লঘু করার চেষ্টা করছে। এরই মধ্যে হরিপ্রসাদ বাবুর মন্ত্রব্য চাওয়া হলে তিনি ছোট থেকেই রাহুলের মৃগীর তথ্য দিয়ে কিছুটা ধামাচাপা দেওয়ার চেস্টা করেছেন। সাধারণ মানুষের মধ্যে এবং বিশেষ করে হিউম্যান রইটস ও নারীবাদী সংস্থাগুলো অচিরেই রাহুলের শাস্তি দাবি করেছে। যাকে নিয়ে এত কিছু সে নাকি উড ল্যান্ডসে ভর্তি হয়েছে কিঞ্চিৎ বুকে ব্যাথা নিয়ে। শোনা যাচ্ছে কেউ একজন রাহুলের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে এরই মধ্যে কেস করেছে। জুঁথি ভাবলো তাদের হয়ে কোন সুহৃদয় মানুষ কেস করতে পারে, হয়তো রাহুলের কোন রাইভাল হবে, নাকি সেই শুভাকাঙ্খী? এদিকে প্রথম সারিতে বসা কিছু সাংবাদিক গোছের সমাগম দেখে  

মনে হচ্ছে সেই কলারের খোঁজে কেউ সায়েন্টিস্ট জুঁইকে সনাক্ত করেছেকি? 


একের পর এক রাধারমণ বাবু থেকে রক্তিম স্যার সবাই জুঁথির ছাত্রী হিসেবে প্রতিভা থেকে তার বিশ্বের মানচিত্রে খ্যাতি নিয়ে বক্তব্য রাখলেন ও অনেক আশীর্বাদ করলেন তার জন্মদিনে। তারপর প্রিয়জিত যখন জুঁথিকে কিছু বলার জন্য বলল, ও ভেবে উঠতে পারল না কি বলবে…


" আজ আমি যা বা যতটুকু সবই আমার মা বাবার জন্য। ছোট থেকে ওনারা আমাকে শিখিয়ে ছিলেন কি করে প্রতিনিয়ত নিজেকে improve করতে হবে, শুধু মাত্র পড়াশোনায়, গানে অথবা খেলা ধুলায় নয়, একজন সামগ্রিক মানুষ হিসেবে। মানুষের সংজ্ঞা কি একদিন বাবা কে জিজ্ঞেস করি, তার উত্তরে উনি বলেন " মানুষ হল যে Man whose life is meant for others.প্রকৃত স্বার্থপর মানুষ পরের স্বার্থ দেখে নিজের আগে।"ছোটবেলায় প্রত্যেক জন্মদিনে মা বাবার সঙ্গে আমি পাশের বস্তিতে অথবা কোন অনাথ আশ্রম বা বৃদ্ধাশ্রমে যেতাম, আর সারাদিন সবার সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিতাম। আমি জানতাম বাবা কতজন দুস্থ ছাত্রের পড়াশোনার খরচ দিতেন, আর অবশ্যই সবার অন্তরালে। আমি যখন ক্লাস সেভেনে উঠলাম মাকেও দেখেছি বলতে "মনি, তুই এখন থেকে তোর সময় বার করে পাশের পাড়ার কিছু দুস্থ ছেলে মেয়েকে বিনা পয়সায় পড়াবি।" আমি যখন পড়াতাম, মা ও ওদের পেট পুরে খাইয়ে তারপর বাড়ি পাঠাত।


বাবার কথাতেই বলি, " যতই বয়েসে বা অভিজ্ঞতায় বড় হই, রোজই যেন আমরা প্রকৃত বড় মাপের হৃদয়ের অধিকারী হতে পারি "। স্কুল লাইফে আমি জানি বেশি কথা বলতে পারতাম না বলে অনেকেই আমাকে ভুল বুঝত। তাও যাদের সাথে একটু বেশি close ছিলাম, যেমন প্রিয়জিত অথবা রেণুকা ওরা জানত আমি সব বন্ধুদেরই খেয়াল রাখতাম,কখনো নিজে ভালো ফল করব বলে নোটস শেয়ার করিনি, বা কেউ কিছু জানতে চাইলে তাকে বুঝিয়ে দিইনি, এরকম হয়নি। 


এরপর কলেজে গিয়েও সবাই আমাকে বন্ধু ভাবতে পারেনি, হয়তো আমারই দোষ, কারণ আমি ততটা মিসুখে ছিলাম না। এর মধ্যেই একজনের কথা আজ না বললেই নয়। (কিছুটা সামলে নেয় নিজেকে জুঁথি) ময়ূখ, ওর সাথে যখন প্রথম আলাপ হয় সত্যি বলতে আমার একটু ক্ষেপাটেই লাগত ওকে। ও একশটা কথা বললে উত্তরে আমি একটা বলতাম, তাও ও কিছুই মনে করত না। এত বিষয়ে ওর জ্ঞান ছিল তবু একটুও ইগো ছিলোনা। ওর কাছে আমি শিখতাম কি করে ল্যাবে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে থিওরিকে প্রাক্টিকালে রূপ দিতে হয়। পরে নিজে যখন গবেষণা করেছি, যতবার ফেল করেছি ততবারই ওর অধ্যবসায় ও never say die attitude আমাকে মানসিক সাহস জুগিয়েছে। ময়ূখ কখনো ছিল হয়নি আমার কাছে যতই তার জীবনে এক অন্ধকারাচ্ছন্ন অধ্যায় নেমে আসে শুধু আমার কারণেই।

আজকের এই জন্মদিনটা আমার কাছে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ কারণ এমনই আমার একটা জন্মদিনে সে আমাকে শ্রেষ্ঠ উপহারটা দিয়ে হারিয়ে যায়। আমাকে ট্রিট দেওয়ার সুযোগটাও দেয়নি। আজ আমার গবেষণার সাফল্য আমি ময়ূখকে উৎসর্গ করলাম।"


হঠাৎ জুঁথি ওর পিঠে একটা চেনা স্পর্শ অনুভব করলো। ফিরেই দেখে ওর বাবা ওর দিকে চেয়ে মিটি মিটি হাসছে " কিরে কেমন সারপ্রাইজ দিলাম?"

স্টেজের মধ্যেই জুঁথি পায়ে হাত দিয়ে প্রনাম করতে গেলে বাবা মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরেন।

এরপর মাইকটা জুঁথির হাত থেকে নিয়ে " আজ আমার গর্ব হচ্ছে সত্যি আমার মেয়েটা বড় হতে পেরেছে। আপনাদের আশীর্বাদ পেলে ও নিজের জন্য নয় আমাদের দেশ তথা বিশ্বের জন্য কিছু যেন ভালো করতে পারে। আমি নিজের অভিজ্ঞতায় শিখেছি, প্রতিটি বিজ্ঞানের দানের সঙ্গেই একটা অভিশাপ ও জন্ম নেয়, তাই আমরা যারা আজীবন বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী সর্বদাই যেন সচেতন ও সচেষ্ট থাকতে পারি। 

এবার আপনাদের সামনে আমি আমার মেয়ে কে ওর জন্মদিনে একটা উপহার দিতে চাই।" 


এরপর জুঁথিকে অবাক করে পড়িয়ামে উঠতে দেখা যায় সত্যবানকে, সেই কালো একটা গগলস পরে, হাতে তার গিটার। অবিনাশ বাবু মাইকটা এগিয়ে দেন।


সত্যবান শুরু করে বলতে " নমস্কার, আমাকে হয়তো আপনারা কেউই চিনবেন না, যদিও কাউকে, কাউকে আমি চিনি। আমার পরিচয় হল... আমার নাম সত্যবান বিস্বাস, ইসরোর একজন সায়েন্টিস্ট, আর আমার ফ্রেন্ড, ফিলসফার ও গাইড শুধু নয় আমার নব জীবনের কারিগর, ডক্টর অবিনাশ মিত্র। 


আমার জীবনে একটা দুর্যোগের পরে যখন আমি ও আমার পরিবার বেঁচে থাকার সমস্ত আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম, ভগবানের মত অবিনাশ কাকু আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। আমার উচ্চশিক্ষা, নিরলস গবেষণা করার জন্য ল্যাব থেকে আজকের এই প্রতিষ্ঠার পেছনে এই মহামানবের হাত আছে।"


মাইকটা প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে অবিনাশবাবু বললেন " ছেলেটা বড্ড বিনয়ী, আমাকে ভালোবাসে তাই এতগুল উপমায় আমাকে ভরিয়ে দিল, যেগুলোর আমি যোগ্য নই। আসলে ও নিজে একজন ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র ছিল আর ওর জন্য যেটুকু করেছি শুধু দেশের দশের স্বার্থেই করেছি…..


দূর যোগ


সবাইকে অবাক করে দিয়ে হঠাৎ পর পর তিনটে কালো গাড়ি সামনে একটা হুটার লাগানো সাদা বোলেরো সশব্দে ব্রেক কোষলো একদম মঞ্চের ধার ঘেষে


আর কেউ নয় স্বয়ং রাহুল সঙ্গে তার পার্সোনাল সিকিউরিটি নিয়ে হন হন করে মঞ্চের দিকে ধেয়ে আসতে গেলে ভোজবাজির মত দর্শক আসনে বসে থাকা সিভিল ড্রেসে থাকা কয়েকজন কমান্ড তাদের পথ আগলে দাঁড়ায়। যুযুধান দুই পক্ষই সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়ার আগেই সত্যবান মাইক নিয়ে বলে ওঠে: 


সত্যবান: আয়, আয় রাহুল, কতদিন পর তোর জনই অপেক্ষা করছিলাম। 

“Commandos please allow just Mr. Rahul on the stage, he is my special guest tonight”.


রাহুল: শুয়োরের বাচ্ছা কে তুই? সালা আমাকে তুইতোকারী করছিস জানিস আমি কে? 


সত্যবান: মন্ত্রিমশাই এত অধৈর্য্য হওয়ার কি আছে? এফ এমে তোর গুনকীর্তির কথা রাজ্যবাসী শুনেছে। তুই এখন ট্রেন্ডিং!


রাহুল: যে তোর পাশে দাঁড়িয়ে, যাকে বিয়ে করবি সে জানিস আমার ফেলে দেওয়া মাল। জুঁথি তুই আমার মাথাটা গরম করে আমার ইমেজ খারাপ করতে পারবিনা। আমার কত ফ্যান ক্লাব আছে তারা আমার হয়ে আন্দোলন করলে সরকার পড়ে যাবে।তোর লুসার মুখপোড়া প্রেমিকের প্রতি এখনো এত টান? দেখ তুই কাকে বিয়ে করতে যাচ্ছিস, একটা এঁটো মাল।


সত্যবান: তুই সোজা হসপিটাল থেকে আসছিস তাই একটু বোস, (এই তোমরা ওকে একটা চেয়ার দাও) এর পর সব কথা শুনলে তোর শরীর খারাপ লাগবে।


তুই খবর নিয়ে দেখ তোর তিলজলা গুহাম, নকশালবাড়ির স্লিপার সেল, বাংলাদেশের কক্সবাজারের এজেন্ট, দিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপে আশ্রয় নেওয়া তোর সাগরেদ ফেরার সঞ্জয়, দুবাইয়ের এজেন্ট আরিফ থেকে এরশাদ এদের সবার কাছেই একযোগে STF, NIA থেকে ইন্টারপোল গ্রেফতারি থেকে পাচারের সব মাল বাজেয়াপ্ত হয়ে গেছে। যে সকল নিরীহ মেয়েদের, শিশুদের দেহ পাচার আর ডার্ক ওয়েবের শিকার করতিস তাদের উদ্ধার করা হয়েছে। তোর টেররিস্ট যোগ আর দেশের মধ্যেই নাশকতার সব ছক বানচাল করা হয়েছে।


দুঃখের কথা তোর মুখ্যমন্ত্রী থেকে কাকাও জানে এখন তাই অপরমহলের চাপে হাসপাতাল থেকে এখানে তোর আপ্যায়নের সুব্যবস্থা করে দিতে বাধ্য হয়েছে। তোর বিরুদ্ধে UAPA ধারায় কোর্টে মুভ করা হয়েছে তাই এখান থেকে জামাই আদরে সোজা তিহার…অফিসাররা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।    


রাহুল: You bastard! ( প্রচন্ড রাগে রাহুল পকেট থেকে তার রিভলবারটা বার করে জুঁথি আর সতীবানকে লক্ষ্য করে পর পর ছয়বার ফায়ার করে। সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তারক্ষী জওয়ানরা তাকে হ্যান্ড কাফ পরিয়ে এরেস্ট করে নেয়) 


সত্যবান: হাহা হাহা…. (অট্টহাসে ফেটে পড়ে সত্যবান) একটা লুসার…এসিডের টিউবটা সেদিন ছুঁড়ে কি ভেবেছিলিস আমাদের জীবন শেষ করে দিবি? তোর নিজের দেহরক্ষীরাই তোর বুলেট সরিয়ে রেখেছিল আর তুই ফাঁকা আওয়াজ করে আবার একটা আটেম্প টু মার্ডার ধারা যোগ করে তিহারের মেয়াদ বাড়ালি। যাবজ্জীবন এমনিতেই হত।


(হঠাৎ সত্যবান তার কালো চশমা খুলে ফেলে, তার সঙ্গে তার সরু গোঁফটাও খুলে ফেলতেই, তাকে দেখে রাহুলের ভিরমি খাওয়ার যোগাড়)  


সত্যবান: I ama Vignesh Pillai,(চোখ মেরে) কি ডিলটা ফাইনাল তো? 


শুনে রাখ তোর বিরুদ্ধে সব ইনভেস্টিগেশন আমি করেছি। আর ওই জুঁথি তোর স্বীকারোক্তি ওর আবিষ্কারের নিখুঁত সফল প্রয়োগ মাত্র।    


অশ্রাব্য গালাগালি দিতে দিতে, রাগে ফেটে পড়া রাহুলকে কেন্দ্রীয় অফিসাররা টানতে টানতে প্রিজন ভ্যানের দিকে যখন নিয়ে যাচ্ছে তখন মঞ্চে অবিনাশবাবু সত্যবানের হাত থেকে মাইকটা নিয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে…


অবিনাশবাবু: সবার সামনে আজ জুঁথি তোর কাছে একটা honest confession করতে চাই। তোর সবচেয়ে ভাল বন্ধু হয়েও দশটা বছর ধরে বুকে পাথর রেখে বলতে পারিনি, ময়ূখ ভালো আছে। ওর চোখের জ্যোতিও ফিরে পেয়েছে কঠিন সার্জারির পর, আর অবশ্যই ওর মুখেও প্লাস্টিক সার্জারি করতে হয়েছে। ওর ভোকাল টোন ও বদলে গেছে ভোকাল কর্ডের অস্ত্রপচার এর পর।ওর ফ্যামিলির সাথে এখন ওরা চেন্নাইতেই থাকে। তুই জানিস, সরকারি অনেক সিক্রেটস আমাদের আজীবন দেশের স্বার্থে গোপন রাখতে হয়, আর আমিও চেয়েছিলাম তোরা, জীবনের সংঘাতে জেদটা জীবিত রাখিস। শুধু তাই নয়, এখানে থাকলে আবার ও আর ওর পরিবার ষড়যন্ত্রের শিকার হত। সেই কারণেই এফিডেভিট করে আজ ওর নব জন্ম হয়েছে সত্যবান রূপে।"  


ওদিকে অবিশ্বাসীর মত নিথর হয়ে জুঁথি ওর বাবার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে ছিল, শুধু তার দুই চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় ভালোবাসার বর্ষা নামছিল। ততক্ষণে স্টেজে ময়ূখের মা, বাবাকেও উঠতে দেখে ও।


"এবার আমার মেয়েটাকে আর ধন্ধে রাখিসনি বাবা। প্লিস ময়ূখ…


সত্যবান ওরফে ময়ূখ জুঁথির দিকে চেয়ে বলে- আমি আজীবন তোমার শুভাকাঙ্খী থাকব.. শুধু তোমারই জন্য (গান ধরে)


"কখনো যদি আবার মনে পড়ে এই গান 

মেঘলা কোনো বিকেল, অথবা ঝড়ের রাত 

মনে  রেখো তবু, শুধু তোমারি জন্য গেয়েছিলাম

এসে ফিরে যায় ফাগুন গেয়ে কি গুনগুন, ঝরাপাতাদের দলে খোঁজে কি অনুক্ষণ,

তুমি নাকি আর আসবেনা ফিরে….আসবেনা...আসবেনা….ভালোবাসবেনা। 

তবুও যদি আবার মনে পড়ে এই গান 

মেঘলা কোনো বিকেল, অথবা ঝড়ের রাত 

মনে  রেখো তবু, শুধু তোমারি জন্য গেয়েছিলাম…"


জুঁথি শুধু সত্যবান এর মধ্যে সেই ঝাঁকড়া চুলের বকবকে ছেলেটাকে খুঁজতে চাইছিল। কখনো যদি আবার...


প্রত্যয় সুর


কখনো যদি আবার (গানের লিরিক্স : প্রত্যুষ সুর )

 


       


Comments

Popular posts from this blog

Let Candles Light Torches

Silent Night (Lyrics)

Silent Night, Lunar escape Lonesome Moon keeps me awake The light's ajar, my room inundate The sylvan stars conspire to sedate Far fireflies swimming in the sky When they whisper along, the songs of the lone Breezing by, lightyears die,  like a perfect lie, Seems so nigh,  Makes me again, aware in your arms When I'm awake, in the daybreak finding me to myself, the starry delight of the night your dewy lips are still, kissing me I can feel. Lyrical Adaptation from Bengali Lyrics by Pratyush Sur ( নৈঃশব্দের অগোচর )